নরসিংদী শহরের পুলিশ লাইন সংলগ্ন এলাকায় গভীর রাতে একটি গাড়ি মেরামতের গ্যারেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিক (২৩) নামে এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘিরে এখনও এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, সহকর্মী ও স্বজনদের অভিযোগ—এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনার তিন মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত জড়িত দুর্বৃত্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জানা গেছে, নিহত চঞ্চল কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের খোকন চন্দ্র ভৌমিকের ছেলে। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নরসিংদীর ওই গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন। প্রতিদিনের মতো ঘটনার দিন রাতেও কাজ শেষে গ্যারেজের ভেতরেই ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা গ্যারেজের শাটার বাইরে থেকে বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। গ্যারেজের ভেতরে থাকা পেট্রোল, মবিল ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থের কারণে মুহূর্তেই আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। আগুনের ভেতর থেকে চঞ্চলের আর্তচিৎকার শোনা গেলেও শাটার বাইরে থেকে বন্ধ থাকায় তিনি বের হতে পারেননি। পরে ঘটনাস্থলেই দগ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরপরই এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজন ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে গ্যারেজের সামনে ঘোরাফেরা করতে এবং আগুন লাগানোর পর দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। এ কারণে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছেন এলাকাবাসী।
নিহতের পরিবার ও সহকর্মীরা জানান, চঞ্চল অত্যন্ত শান্ত, পরিশ্রমী ও নিরীহ স্বভাবের ছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তার মৃত্যুতে পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা দ্রুত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় মামলার বাদী মাসুদ রানা রুবেল চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি অভিযোগ করেন, “আমার দোকানে আগুন লাগিয়ে একজন মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত তাদের শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার পর মামলা দায়ের করা হলেও প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখনো মামলার সঠিক তথ্য উদঘাটন হয়নি। আমি ও আমার পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। যেকোনো সময় আবারও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আকুল আবেদন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক।”
এ বিষয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ করছে একাধিক টিম।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ঘটনাটি নিয়ে এখনও ব্যাপক আলোচনা চলছে। মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন মহল বলছেন, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের গ্রেপ্তার করা না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আরও উদ্বেগ তৈরি হবে।
নরসিংদীর এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গই নয়, বরং সমাজে নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন সবার প্রত্যাশা—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক এবং অপরাধীরা দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হোক।